No icon

ভাঙন আতঙ্ক ৩০ জেলায় ২৫ কি.মি. বাঁধ ভেঙেছে : ঝুঁকিপূর্ণ আরও ৩২৫ পয়েন্ট

যোদ্ধা ডেস্কঃ সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের হার্ডপয়েন্ট এলাকায় ফাটল দেখা দিয়েছে। এই খবরে শহরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেরই আশঙ্কা যেকোন মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে শহর ও শহরতলীর গ্রামগুলোতে বন্যার পানি ঢুকতে পারে। এছাড়াও নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ভাঙনের শঙ্কাও রয়েছে। আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে মানুষ। শুধু সিরাজগঞ্জ নয়, পাবনা, গাইবান্ধা, বগুড়া, নওগাঁ, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ অনেক জেলার মানুষ এখন ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। এদিকে, গত দুদিন ধরে হু হু করে বাড়ছে পদ্মার পানি। তাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরিয়তপুর ও ফরিদপুর জেলার মানুষের মধ্যে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি বন্যায় সারাদেশে ৩০ জেলার ২৫ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ২৮০ কিলোমিটার বাঁধ আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ৩২৫টি পয়েন্ট।

এছাড়া সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ এসব জেলায় ৩ হাজার কিলোমিটার বাঁধ পানির নিচে ডুবে গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছে থেকে এ তথ্য জানা গেছে। গতকাল শুক্রবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ২২ পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বিভিন্ন নদীর পানি। পূর্বাভাসে বলা হয়, তবে একই সময়ে বগুড়া, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, সিলেটে ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে।

গতকাল পর্যন্ত বন্যা আক্রান্ত জেলাগুলো হচ্ছে, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, টাংগাইল, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর। 
গাইবান্ধা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ইনকিলাবকে জানান, এ জেলায় মোট ২৪২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে এ বন্যায় বিলীন হয়েছে ৬০০ মিটার, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ কিলোমিটার, আঘাত হেনেছে ১৩০ কিলোমিটারে এবং ১৮টি পয়েন্ট ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া ৭৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে নানা সমস্যা রয়েছে। এসব অংশের ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে সাইকেল, মোটরসাইকেল, রিকশা-ভ্যান চলাচল করছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম ইনকিলাবকে জানান, কুড়িগ্রাম জেলায় ৯টি উপজেলার মোট ১৯২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। এ বন্যায় ২০ মিটার বাঁধ ভেঙে গেছে। ৫৩ কিলোমিটার ঝুঁকিতে রয়েছে। ৪০টি পয়েন্টে বন্যার পানি আঘাত হেনেছে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, এ জেলায় ৪৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। ৪০টি পয়েন্টে বন্যা আঘাত হেনেছে। তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এখনো হয়নি।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, সিরাজগঞ্জ জেলায় ৮০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। এ জেলায় বেশিরভাগ বাঁধ ভাল রয়েছে। তবে যেসব এলাকায় বন্যার পানি আঘাত হেনেছে সে পয়েন্টগুলো মেরামত করা হয়েছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, এ জেলায় সাড়ে ৩শ’ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং ১ হাজার কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ রয়েছে। এর ডুবন্ত ১ হাজার কিলোমিটার বাঁধ এখনো পানির নিচে রয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, এ জেলায় ১৫শ’ কিলোমিটার বাঁধ এখনো পানির নিচে ডুবন্ত রয়েছে।

জামালপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নব কুমার ইনকিলাবকে জানান, এ জেলায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি পয়েন্টে বন্যা আঘাত হেনেছে। কোন বাঁধ ঝুঁকিতে নেই। তিনি বলেন,বন্যার পানিতে যেসব রাস্তা ডুবেছে তা আমার নয়। এগুলো স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের।

নেত্রকোনা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আকতারুজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন,এ জেলায় মোট বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে ৬০ কিলোমিটার, এর মধ্যে ডুবন্ত বাঁধ রয়েছে ৩১০ কিলোমিটার। এখনো তেমন ঝুঁকি নেই। তবে ৩৩টি পয়েন্টে বন্যা আঘাত হেনেছে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ইনকিলাবকে জানান, এ বারের বন্যায় এখন পযন্ত ১০ মিটার বাঁধ নদীতে ভেঙ্গে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। ঝুঁকিতে রয়েছে ৫ কিলোমিটার। আর ২৭টি পয়েন্টে বন্যা আঘাত হেনেছে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রক্ষা বা তদারকির দায়িত্ব যে সংস্থার, সেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, নদীতে যখন পানি আসে তখন দুই দিকের পানির লেভেলের তারতম্যের কারণে পানি চুঁইয়ে আসে। একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত মাটির বাঁধগুলো বন্যা ঠেকাতে পারে। কিন্তু এর বেশি হলে সেটা ভেঙ্গে যায়। আবার অনেক সময় বাঁধের ভেতর ছোট ছোট ফাঁকা থাকে। সেটা নানা কারণেই হতে পারে। পানি বা বাতাস চলাচল, ইঁদুরের যাতায়াত অনেক কারণে হতে পারে।

আমাদের টাঙ্গাইল জেলা সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইলের ভ‚ঞাপুরের টেপিবাড়ী এলাকায় ভ‚ঞাপুর-তারাকান্দি বাঁধ ভেঙে নতুন করে আরো ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জেলা শহরের সাথে তারাকান্দি ও সরিষাবাড়ির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অপরদিকে বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশে মেরামতের কাজে অংশগ্রহণ করেছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

টাঙ্গাইলে যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ০৮ সে.মি. বেড়ে বিপদসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ৬টি উপজেলায় নদী তীরবর্তী ২২টি ইউনিয়নের প্রায় ১২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

শিবচর (মাদারীপুর) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, অব্যাহত পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাদারীপুরের শিবচরে ৩ ইউনিয়নে পদ্মা নদী ভাঙন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৩০টি ঘরবাড়িসহ কয়েকদিনে শতাধিক ঘর বাড়ি, ১টি মাদরাসা, কালভার্ট বিলীন হয়েছে নদীতে। ভাঙনের মুখে পড়েছে ৩টি স্কুল ভবনসহ ৫টি স্কুল, ২টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র-কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন হাটবাজারসহ ৩ ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হাজারো বসত বাড়ি। ভাঙন কবলিতরা বসত বাড়ি গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটে যাচ্ছেন।

পদ্মার ভাঙন আতংকে জাজিরার ২টি বিদ্যালয়সহ বহু স্থাপনা 
শরীয়তপুর জেলা সংবাদদাতা জানান, জেলার জাজিরা উপজেলায় পদ্মা নদীর ভাঙনের মুখে পড়েছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। সেই সাথে ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে ৯ নং কাজিয়ার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই বিদ্যালয় দুইটিতে প্রায় ৬ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ঠিকাদারের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে ১৫ হাজার বালুর বস্তা (জিওব্যাগ) ফেলা হচ্ছে। আর ১০০ হাত দূরে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। তার পাশে ভানু মল্লিক কান্দি জামে মসজিদ, কাজিয়ার চর কমিউনিটি ক্লিনিক ও ১৮টি দোকান নিয়ে কাজিয়ার চর বাজারও ভাঙনের মুখে রয়েছে।

রাণীনগর (নওগাঁ) উপজেলা সংবাদদাতা জনান : নওগাঁর রাণীনগরের নান্দাইবাড়ি-মালঞ্চি বাঁধ ভেঙে গেছে। শুক্রবার ভোর রাতে এই বাঁধটি ভেঙে যায়। এতে করে ওই এলাকার ৩টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তবে নদীতে পানির গতিবেগ কম থাকায় ক্ষয়ক্ষতি কম হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উত্তরের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে নদী ফুঁসে উঠে । এতে রাণীনগর উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর নান্দাই বাড়ী-মালঞ্চি বেড়ি বাঁধের কয়েক জায়গায় ফাটল দেখা দেয়। অবশেষে নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির চাপে নান্দাই বাড়ী মাদরাসার দক্ষিণে প্রায় ৩০ ফিট বাঁধ ভেঙে যায়।


এদিকে, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে সন্ধ্যা, সুগন্ধা নদী আর আড়িয়াল খাঁ নদ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এ উপজেলায় নদী ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এবারেও এর ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়নি। এরইমধ্যে নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিলীন হতে শুরু করেছে।

সিরাজগঞ্জে শহররক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ খবরে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেকা দিয়েছে। জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী কে এম রফিকুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধটি কেপিআইভুক্ত এলাকা। এ বাঁধটি রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। হার্ডপয়েন্ট এলাকায় যমুনার প্রবল স্রোতে থাকায় বাঁধের লাঞ্চিং এপ্রোনে গিয়ে আঘাত করে। এতে দু’টি ব্লকের মাঝখানে একটি গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে সকাল থেকেই সেখানে সিসি ব্লক ডাম্পিং করা হচ্ছে। তবে এ নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। 
অন্যদিকে, তীব্র স্রোতে ভেঙে গেছে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়ক।

গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে সড়কটির বেশ কিছু অংশ ভেঙে পানি ঢুকে যায়। এতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে আরো ১০টি গ্রাম। ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়কে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। বঙ্গবন্ধু সেনানিবাসের ১৮ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের সেনা সদস্যরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। 
এ ছাড়া নাটোরের সিংড়া উপজেলায় বন্যার পানির স্রোতে বক্তারপুর ব্রিজ ভেঙে উপজেলা সদরের সঙ্গে অন্তত ৩০টি গ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

Comment