দেশ

‘নির্বাচনী’ মাঠ প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ

যোদ্ধা ডেস্কঃ আগামী ফ্রেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের বিষয়ে সব ধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারও বসে নেই। প্রশাসনও আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে এখন থেকে প্রশাসন সাজানোর কাজ শুরু করেছে। হঠাৎ করে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন দাবিতে পরিবেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। আবার একের পর এক রাজনৈতিক দলের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। আবার মাঠ প্রশাসনের ভোটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করলে তাকে প্রত্যাহার করে প্রচলিত আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে যুগ্ম-সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) তুলে আনা হবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর হামলা, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমানের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, বিভিন্ন অঞ্চলে মব সন্ত্রাস অন্তর্বর্তী সরকারকেও ভাবিয়ে তুলেছে। এসব ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক সংগঠনের যোগসাজস থাকতে পারে বলে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলের নেতারা অভিযোগ করে আসছেন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি না হলে নির্বাচন অনেকটাই চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বড় ছোট রাজনৈতিক দলগুলো।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতকাল বুধবার বিকালে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে বসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিনিয়র সচিব, দেশের সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপাররা (এসপি) অংশ নেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এখন থেকে জেলা-উপজেলায় কোনো মেলা ও সমাবেশ নয়। শুধু নির্বাচন নিয়ে সভা-সমাবেশ করার অনুমোদন দেয়া হবে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাদের মতলব ভালোভাবে খতিয়ে দেখা। আবার যারা বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাস্তায় মানববন্ধের নামে যানজট সৃষ্টি করে তাদের উদ্যেশ্যগুলো আগে খতিয়ে দেখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। ইতোমধ্যে অনেক জেলা-উপজেলায় মেলা বন্ধের নির্দেশনা জারি করেছে ডিসিরা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান বলেন, মাঠ প্রশাসনের ভোটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করলে তাকে প্রত্যাহার করে প্রচলিত আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে যুগ্ম-সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) তুলে আনা হবে। যেসব জেলা থেকে পদোন্নতি পাওয়া ডিসিদের তুলে আনা হবে সেখানে নতুন ডিসি পদায়ন করতে হবে। মাঠ প্রশাসন বলতে সিভিল এবং পুলিশ এই দুটোকেই বোঝায়। মোখলেস উর রহমান জানান, নির্বাচন সামনে রেখে যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে হোমওয়ার্ক ভালো থাকলে যে দিনটাকে কেন্দ্র করে কাজটা করা হচ্ছে, সেই দিনটা ভালো হবে, কোনও সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, অভিযোগের বিপরীতে ডিসি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। আমাদের কাছে ফিট লিস্ট আছে। মাঝে কিছু নতুন ডিসি পদায়ন করা হয়েছে, সামনে আরো হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নিয়োগ স্বচ্ছ করার জন্য লটারিতে তারা এসপি নিয়োগ দেবে। তিনি বলেন, ইউএনওদের বদলিটা করেন বিভাগীয় কমিশনার। নির্বাচনের সময় একটা বড় ধরনের রদবদল হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, ইউএনওরা হলো অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার। এরপর হলো ডিসি। ডিসি নিয়োগের জন্য আমাদের জনপ্রশাসন সংক্রান্ত সাত সদস্যের একটি কমিটি আছে। এছাড়া ডিসি সিলেকশন কমিটি আছে পাঁচ সদস্যের, ডিসি ফিট লিস্ট হয়। ফিট লিস্টের পর কমিটিতে সেটা তোলা হয়। সেখান থেকে দেখে ডিসি পোস্টিং হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলা প্রশাসক ইনকিলাবকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নির্বাচনকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু কঠোর নির্দেশনা দিলেই হবে না, রাজনৈতিক দলের মধ্যে আস্থার পরিবেশও তৈরি করতে হবে। শুধু প্রশাসন দিয়ে সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে না। সহনশীলতা না থাকলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে বেগ পোহাতে হবে।

জানা গেছে, বৈঠকের শুরুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মাঠের সর্বশেষ বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। একাধিক জেলার ডিসি ও এসপিরা তাদের জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তুলে ধরেন। সাম্প্রতিক রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ-সংঘাত-উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত ২৭ আগস্ট আন্দোলনরত প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের যমুনা অভিমুখে যাত্রা ঘিরে তাদের ওপর পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, জলকামান ব্যবহার ও লাঠিপেটার ঘটনা ঘটে। এতে অনেক শিক্ষার্থী আহত হন। গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। ৩০ ও ৩১ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এর জেরে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি গত সোমবার সকালের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী হল না ছেড়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এ ছাড়া ডাকসু, জাকসু, রাকসু ও চাকসু ছাত্রসংসদ নির্বাচন ঘিরেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাঠ প্রশাসনকে শক্ত অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি আরও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সভায় বলা হয়, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা চলতি মাসের শেষের দিকে। এই পূজাকে কেন্দ্র করে দেশের কোথাও যাতে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে মাঠ প্রশাসনকে কঠোরভাবে নজরদারি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশপাশি প্রতিবারই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে একটি চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর মন্তব্য করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অপচেষ্টা করে থাকে। এবারও করার অপচেষ্টা থাকতে পারে সেই কারণে কেউ বক্তব্য দিলে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি পূজাম-পে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার নির্দেশনা থাকবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এতে প্রশাসনিক ও আইনগত সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। বৈঠকে আরো নির্দেশনা দেওয়া হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের কোথাও মেলা বা বড় ধরনের উৎসব আয়োজন করা যাবে না। আবার রাজনৈতিক সমাবেশ হলে আগেভাগেই প্রশাসনকে জানাতে হবে। এসব সমাবেশে যথাযথ অনুমোদন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ও গোয়েন্দা নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে এ ব্যপারে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

বৈঠকে চট্টগ্রামের ডিসি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংগঠনগুলোর ছোটখাটো দ্বন্দ্ব বড় সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। এর পেছনে বহিরাগতদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন। ময়মনসিংহের এসপি জানান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছিল। দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও রাজনৈতিক মহল এ ধরনের ঘটনার সুযোগ নিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ডিএমপির এক প্রতিনিধি বলেন, রাজধানীতে রাজনৈতিক সমাবেশ প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও হঠাৎ করে ভিন্ন আকারে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিভাগীয় কমিশনার বলেন, অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে ছোটখাটো ঘটনা বড় আকার নেয়। ভয়ভীতি তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা হয়। তাই শুরুতেই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসনের সকলেই চান, জনগণ যেন নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button