কোন অজুহাতেই শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করা যাবে না
যোদ্ধা ডেস্কঃ নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে। কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ কিংবা উসকানিমূলক কর্মকা- বরদাশত করা হবে না। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে কোথাও কোথাও ভুল-বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, সেটি যেন কোনোভাবেই প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়। তাঁর ভাষায়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিজয়কে প্রতিহিংসার মাধ্যমে কলঙ্কিত করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।
তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দলমত, ধর্ম-বর্ণ বা রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ কোনো অজুহাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায়পরায়ণতা হবে আমাদের নৈতিক ভিত্তি, আর আইনের শাসন হবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান স্তম্ভ। তিনি যোগ করেন, সরকারি দল বা বিরোধী দল, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইন সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে, এবং তা হবে বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুসারে, কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে ভূমিধ্বস বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। নির্বাচনে বিজয় লাভের পর গতকাল শনিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপিকে বিজয়ী করায় দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন, এই স্বাধীনতা ভোটের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষার স্বাধীনতা। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে জনগণের সরাসরি ভোটে দায়বদ্ধ সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, দেশের মাটিতে সকল শক্তির উৎসই দেশের জনগণ। জনগণের ভোটই সর্বোচ্চ ক্ষমতা।
তবে তিনি বাস্তবতার কঠিন দিকও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের বহু প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং আর্থিক খাত—সবখানেই সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন, জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী ধাপে ধাপে এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানে সহাবস্থান, মতের ভিন্নতা এবং বিতর্কের স্বাধীনতা। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। আমাদের পথ ও মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। গণতান্ত্রিক চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে হলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অর্ন্তর্বতীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, সব সংশয় ও আশঙ্কা কাটিয়ে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাও তিনি উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের ভিত্তিতে প্রণীত ৩১ দফা কর্মপরিকল্পনা এবং নির্বাচনী ইশতেহারই হবে সরকারের নীতিগত দিকনির্দেশনা। তিনি বলেন, এই রূপরেখা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করাই হবে আমাদের লক্ষ্য। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যখাতের সম্প্রসারণ, এসব অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া-কে স্মরণ করে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তার ত্যাগ ও আপসহীন অবস্থান বিএনপি ও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আল্লাহর দরবারে তাঁর মাগফিরাত কামনা করেন তিনি।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। এবার দেশ গড়ার পালা। তিনি আহ্বান জানান, নির্বাচনের উচ্ছ্বাস যেন দায়িত্ববোধে পরিণত হয় এবং কোনোভাবেই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না করে। গণতন্ত্রের বিজয়কে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে উদ্যাপন করতে হবে বলেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে দেশি ও বিদেশী গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তারেক রহমান। বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে বিদেশী সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ আমাদের কাছে প্রথম। বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের স্বার্থ ঠিক রেখে আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করবো।
একই প্রশ্নের উত্তরে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি অনুসরণ করে দি প্রিন্সিপাল অব মাল্টিলেটারিজম। উই ডোন্ট হেম এ্যানি কান্ট্রি সেন্ট্রিক পলিসি এজ সাচ। সো আওয়ার পলিসি অ্যাপলাইজড টু এনাদার কাউন্ট্রি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড, দিস ইজ ফর মিচুয়াল রেসপেক্ট, মিচ্যুয়াল ইন্টারেস্ট, নান অফ ইন্টাফেয়ারেন্স এন্ড স্ট্র্যাটেজিক অটোনোমি ফর বাংলাদেশ। এটা হচ্ছে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি।
ভারতীয় এক সাংবাদিক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা বিচার বিভাগের বিষয়। অফ কোর্স উই লাইক টু জুডিশিয়ারি সেপাটরেট ফর্ম, এক্সিকিউটিভ ফ্যাংশন এ্যান্ড ল্যাজিলেটিভ ফ্যাংশন।
ভারত-পাকিস্তান-চীনের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে? এ বিষয়ে তিন দেশের সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ আমাদের কাছে প্রথম। বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের স্বার্থ ঠিক রেখে আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করবো। পরবর্তীতে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র নীতি ইতোমধ্যে আমি বলেছি। দেশের স্বার্থ ঠিক রেখে আমাদের পলিসি হবে।
গত সরকার চলে যাওয়ার পর থেকে আপনি (তারেক রহমান) বলে আসছেন যে এই নির্বাচনটা খুব সহজ হবে না। এখন নির্বাচনটা হয়ে গেলো, এটা আপনার কাছে সহজ ছিলো কিনা? আর আপনাকে দু‘শর বেশি আসন পাওয়ার জন্য কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং করতে হলো কিনা? এমন প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের জনগণকে কনভিন্স করাটাই হচ্ছে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাদের যে ইঞ্জিনিয়ারিংটা ছিলো জনগণকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা, সেটাতে আলহামদুলিল্লাহ আমরা সফল হয়েছি।”আর জনগণকে কনভিন্স করে একটি সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশের এ্যানসিউর করাটাই ছিলো আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর। অর্থাৎ যেটা আমি বলেছিলাম কঠিন হবে কিনা, যেকোনো ভালো কাজের লক্ষ্য অর্জন করতে গেলে তো কষ্ট করতে হবে, কঠিন হবেই।
যুবকদের জন্য পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা জনগণের রায় পেয়েছি। অবশ্যই যুবকরা আছেন, সমাজের আরও অন্যান্য শ্রেনী-পেশার মানুষ আছেন। আমরা সকলের বিষয়ে এড্রেস করব। আমরা ইতোমধ্যে আমাদের দলের ম্যানিফেষ্টো প্রকাশ করেছি, সেখানে সকল বিষয়ে আমরা এড্রেস করেছি, যুবকদের জন্য কী করব, আমরা নারীদের জন্য কী করব, আমরা ডিজাইবেল পিপলসের জন্য কী করব সব কিছু সেখানে (ইশতেহারে) আছে।
দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা ফোরাম (সার্ক) এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিএনপি কি করবে? এ প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, ইয়েস আপনি জানেন, সার্ক গঠন হয়েছিলো বাংলাদেশের উদ্যোগে। স্বাভাবিকভাবে আমরা সার্ক সক্রিয় করতে চাই। এই বিষয়ে আমরা আলাপ করব। আর হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে আইনানুগ বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ডেফিনেটলি উই উইল ট্রাই টু প্রেটেক্ট ইন্টারেস্ট অব পিপল অব বাংলাদেশ, আমাদের দেশের স্বার্থ ঠিক রেখে আমরা সকল দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ব। আই অ্যাম সিউর মিচ্যুায়াল ইন্টারেস্ট ইজ দি ফাস্ট প্রাইয়োরিটি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে চাইনিজ বন্ধুরা আছেন। আমরা আশা করি, দুই দেশ সামনের দিনগুলো আরও নিবিড়ভাবে একসঙ্গে কাজ করবে।
দেশের অর্থনীতি কিভাবে সচল হবে? এ বিষয়ে বলেন, আরো বেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা আনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি রোধ কীভাবে করবেন প্রশ্নে তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান। আইন যদি সবার জন্য সমান হয়ে থাকে, আমরা ইনশাল্লাহ সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার পরে আমরা চেষ্টা করব, আইন যাতে আইনের মতো করে চলে। সেটাই আমাদের পজিশন।
বিগত সরকারের সময়ে লুটপাট ও পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে আপনার পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে তারেক রহমান বলেন, আপনি যদি আমাদের ইশতেহার দেখেন, সেখানে আপনার এই প্রশ্নের জবাবগুলো আপনি সুন্দরভাবে পাবেন। আমি ইশতেহারে বলেছি যে, গণতান্ত্রিক অর্থনীতি। অর্থাৎ আমরা এমন একটা অর্থনীতি সূচনা করতে চাই যেখানে সবাই সবার যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবেন। কোনো একটা বিশেষ মহলকে আমরা সুযোগ দিতে চাই না।
নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জের বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন সরকারের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে সচল করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক করা, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এছাড়া গত রেজিম (পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ) দেশের সকল প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা। আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করব। এগুলো আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি এবং এগুলোকে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।
এই সংবাদ সম্মেলনের আল-জাজিরা, বিবিসি, এবিসিসহ চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাবলীলভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সমাপনী বক্তব্য রাখেন। এসময় মঞ্চে আরো উপস্থিত ছিলেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দীন আহমেদ, সেলিমা রহমান।




