দেশ

মেননের হুঙ্কারে কাঁপছে যুক্তরাষ্ট্র!

যোদ্ধা ডেস্কঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জো বাইডেন প্রশাসনের উপর ক্ষেপে গেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উদ্দেশ্যে হুংকার দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র থামো। আমাদের নিয়ে মাথা ঘামাবে না। তোমরা তোমাদের নির্বাচন সামলাও। আমরা আমাদের নির্বাচন সামলাব।’ রাশেদ খান মেননের এই হুংকার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক চলছে। নেটিজেনদের কেউ কেউ লিখেছেন, উত্তর কোরিয়া, চীন, রাশিয়ার হুংকার নয়, জো বাইডেন প্রশাসন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের হুংকারে কাঁপছে। নানান রসিকতা করে বক্তব্য দেয়া হয়েছে স্যোসাল মিডিয়ায়। এতে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সংখ্যা বেশি হলেও অনেকেই লিখেছেন, রাশেদ খান মেনন নিজের এমপি হয়েছেন, স্ত্রী লুৎফুন্নেসা খানকে সংরক্ষিত আসনে এমপি করেছেন, তিনি তো হুংকার দেবেন। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী বলেন, রাশেদ খান মেননরা বাম রাজনীতি করেন গরীব-মেহনতি মানুষের ভাগ্য বদলের জন্য। কিন্তু এখন তারা নিজেদের বিবেক আওয়ামী লীগের কাছে বিক্রি করে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন। নিজেরা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, স্ত্রীদের এমপি করেছেন। অথচ স্বাভাবিক ভোট হলে এরা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হতে পারবেন না। আওয়ামী লীগে নুন খাওয়ায় তারা এখন মরিয়া হযেছে উঠেছেন শেখ হাসিনাকে খুশি করতে। এক সময় রাশিয়ার দালালি করলেও এখন এরা চীনে দালালি করছেন। জানা যায়, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস গত পহেলা আগষ্ট রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি ইসির আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চান। অতপর মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, আগামী অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক পর্যালোচনা নির্বাচনী টিম বাংলাদেশে আসবে। তিনি বলেন, ‘প্রাক পর্যালোচনা (প্রি-অ্যাসেসমেন্ট) নির্বাচনী দলে থাকবে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউট এবং ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউটের বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তুতি নিয়ে যাদের অগাধ অভিজ্ঞতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরেপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। যাতে বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে।’ এতেই ক্ষেপে গেছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরীক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। ২ আগষ্ট শাহবাগে ১৪ দলীয় জোট আয়োজিত ‘বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যে’ শীর্ষক প্রতিবাদ প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের চরকায় তেল (দেশ নিয়ে মাথা ঘামানো) দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রাশেদ খান মেনন যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিযুক্ত হওয়ার পরদিনই এই পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ইসিতে গিয়ে জবাবদিহি চেয়েছেন- কিছু দলকে নিবন্ধন কেন দেওয়া হয়নি, ইসির ক্ষমতা কমে গেছে কি না, এসব বিষয়ে। আমি বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র থামো, থামো বাইডেন প্রশাসন। তোমরা তোমাদের নির্বাচন সামলাও। আমরা আমাদের নির্বাচন সামলাব। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের উপর নির্ভর করে নয়, জনগণকে জিম্মি করে ক্ষমতায় যেতে চায়। তারা এখন নির্ভর করছে তাদের প্রভু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উপর। শুধু এবারই নয়, ১৫ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে রাশেদ খান মেনন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি ‘রেজিম চেঞ্জের’ কৌশলের অংশ। তিনি সংসদকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সেন্টমার্টিন চায়, কোয়াডে (কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ) বাংলাদেশকে চায়। বর্তমানের শেখ হাসিনার সরকারকে হটানোর লক্ষ্যে বাইডেন প্রশাসন সব কিছু করছে। তিনি আরো বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যারা বন্ধু, তাদের শত্রুর প্রয়োজন নেই। বেশকিছু সময় আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বাগে রাখতে র‌্যাবের ওপর স্যাংশন দিয়েছে। এখন নির্বাচনকে উপলক্ষ করে ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে। এটা কেবল দূরভিসন্ধিমূলকই নয়, তাদের ‘রেজিম চেঞ্জে’র কৌশল। তারা সেন্টমার্টিন চায়, কোয়াডে বাংলাদেশকে চায়। অথচ এই রাশেদ খান মেনন ২০১৮ সালের রাতের নির্বাচনের পর স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয়নি। ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর বরিশালের এক সমাবেশে রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘বিগত নির্বাচনে আমিও নির্বাচিত (এমপি) হয়েছি। তারপরও আমি স্বাক্ষী দিয়ে বলছি- বিগত নির্বাচনে (২০১৮) জনগণ ভোট দিতে পারেনি। বিগত জাতীয়, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোথাও ভোট দিতে পারেনি দেশের মানুষ। তিনি বলেন, উন্নয়ন মানে গণতন্ত্র হরণ নয়, উন্নয়ন মানে ভিন্ন মতের সংকোচন নয়, উন্নয়ন মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ নয়, উন্নয়ন মানে গণতন্ত্রের স্পেস (সুযোগ) কমিয়ে দেওয়া নয়। সারা দেশে মানবিক মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় ঘটেছে। ক্যাসিনো মালিকদের ধরা হচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের ধরা হচ্ছে, কিন্তু দুর্নীতির আসল জায়গা নির্বিঘœ আছে। সেই দুর্নীতিবাজদের বিচার কবে হবে, তাদের সাঁজা কবে হবে, তাদের সম্পদ কবে বাজেয়াপ্ত হবে। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী চারপাশে দুর্নীতির ঘুনোপোকারা, তার চারপাশে সম্পদ লুটেরারা, তার চারপাশে অর্থ আত্মসাতকারীরা। তারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সম্পাদ গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ থেকেই রাশেদ খান মেনন চীন সফর করেছেন। ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলে তার সঙ্গে ছিলেন জাসদের হাসানুল হক ইনু ও সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়–য়া। এই দীলিপ বড়–য়া ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্পমন্ত্রী হয়েছিলেন। আর হাসানুল হক ইনু হয়েছিলেন তথ্যমন্ত্রী। বর্তমানে হাসানুল হক ইনু এমপি এবং তার স্ত্রী আফরোজা হন রীনা সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি। রাশেদ খান মেনমের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা খান বিউটি সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হয়েছেন। দেশের বেশির ভাগ বাম নেতা হাভাতে থাকলেও এই বাম নেতারা আওয়ামী লীগের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ক্ষমতার মধু জমিয়ে খাচ্ছেন। চীন সফরে গিয়ে রাশেদ খান মেননরা বলেছেন, তারা (চীন) যেন শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারকে আবারও ক্ষমতায় রাখে। কারণ দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখা আবশ্যক। রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, দীলিপ বড়–য়ারা চীন সফরে গিয়ে তাদের ‘চীনকে আওয়ামী লীগের পাশে রাখার’ দুতিয়ালি প্রচার করছেন ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে। অথচ এই সুবিধাবাদী বাদ নেতাদের দুতিয়ালির অনেক আগ থেকেই চীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে সমর্থন দিয়েছেন। শেখ হাসিনা যখন সংসদে ‘যুক্তরাষ্ট্র চায় না আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় থাকুক’ এবং যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন করতে পারে’ মন্তব্যকে সমর্থন করে চীন বিবৃতি দিয়েছিল। অথচ বাম এই নেতারা এখন বোঝাতে চাইছেন চীন তাদের কথায় আওয়ামী লীগের পক্ষ অবলম্বন করছে। অথচ আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে চীন সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে পক্ষ অবলম্বন করে থাকে চীন যায় তার বিপরীত পক্ষে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ছোট দলের বড় নেতা রাশেদ খান মেনন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি যে বিক্ষুব্ধ তাতে বাইডেন প্রশাসন কতটা ভয় পায় সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

এমন আরো সংবাদ

এই সংবাদটিও পরতে পারেন
Close
Back to top button